হযরত শাহ মখদুম (রঃ) এর দরগা; রাজশাহী মহানগরীর প্রথম মসজিদ

হযরত শাহ মখদুম (রঃ) এর দরগা
হযরত শাহ মখদুম (রঃ) এর দরগা

হযরত শাহ মখদুম (রঃ) এর দরগা রাজশাহী মূল শহরের দরগাহপাড়ায় অবস্থিত। তিনি রাজশাহী তথা বরেন্দ্র অঞ্চলে ইসলাম প্রচার করেন। বলা হয়ে থাকে যে তিনি রাজশাহীতে এসেছিলেন কুমিরের পিঠের চরে।

শাহ মখদুম রূপস (রঃ) চৌদ্দ শতকের একজন মুসলিম দরবেশ, যিনি বরেন্দ্র অঞ্চলে ইসলাম প্রচার করেছিলেন। ‘মখদুম’ যার অর্থ ধর্মীয় নেতা এবং ‘রূপস’ অর্থ আচ্ছাদিত। শাহ মখদুম (রঃ) এর প্রকৃত নাম ছিল আব্দুল কুদ্দুছ জালালুদ্দীন। তিনি ছিলেন বড় পীর হযরত আব্দুল কাদের জিলানী (রহঃ) এর পৌত্র এবং আজাল্লা শাহ্ (রঃ) এর ২য় পুত্র।। তিনি ৬১৫ হিজরীর ২ রজব বাগদাদে জন্ম গ্রহণ করেন। রুপোশ তার উপাধী। শব্দটি ফারসী। যার অর্থ মুখ আবরণকারী। তার উপাধি থেকে একথা বোঝা যায় যে, সাধারণ মানব বৈশিষ্ট্য ছাড়াও তার মধ্যে অসাধারণ ক্ষমতা লুকায়িত ছিল। হজরত শাহ মখদুম (র:) এর রাজশাহী আগমনের অন্তরালে আছে এক বিস্তৃত ইতিহাস।

১২৫৯‌ খ্রিষ্টব্দে মোধল বীর হালাকু খান বাগদাদ আক্রমণ করলে বড়পীর আব্দুল কাদের জিলানীর বংশধরগণ বাগদাদ থেকে কাবুল, কান্দাহার, পারস্য ও পাক ভারতের বিভিন্ন স্থানে আশ্রয় গ্রহণ করে। হযরত শাহ্ মখদুম রুপোশ (রহঃ) ‌এর পিতা আজ্জালা শাহ্ দিল্লীতে আশ্রয় গ্রহণ করেন। তার উন্নত চরিত্র ও গুণাবলীর প্রতি মুগ্ধ হয়ে দিল্লীর সম্রাট ফিরোজ শাহ্ তার কাছে বায়েত হন। পিতার সহচার্যে তিন পুত্র সৈয়দ মুনির উদ্দীন আহমেদ (রঃ), হযরত শাহ মখদুম রুপোশ (রঃ), ও সৈয়দ আহমদ তম্বরী (রঃ) অধ্যাত্মিক সাধনায় সমৃদ্ধ লাভ করেন। হালাকু খানের মৃত্যুর পর শাহ আজ্জালা বাগদাদে ফিরে গেলেও তার পুত্রগণ ইসলামের বাণী প্রচারের মাধ্যমে মানুষকে হেদায়েতের উদ্দেশ্যে অনুচরবর্গসহ বাংলায় আগমন করেন।

৬৮৭ হিজরিতে (১২৮৮ খ্রিস্টাব্দে) শাহ মখদুম রূপস বাঘা হতে রামপুর বোয়ালিয়ায় চলে আসেন। এখানে তাঁর আগমনের সাথে অনেক অলীক কাহিনী এবং তাঁর কারামত সম্পর্কে অনেক কিংবদন্তি প্রচলিত আছে। তিনি ওই এলাকার অত্যাচারী তান্ত্রিক রাজাকে পরাজিত এবং জনগণকে রাজার অত্যাচার হতে রক্ষা করেন। শাহ মখদুম (রঃ) তাঁর সঙ্গীদেরকে পার্শ্ববর্তী স্থানসমূহে ইসলাম প্রচারের জন্য প্রেরণ করেন। তাঁরা বিভিন্ন স্থানে খানকাহ প্রতিষ্ঠা করেন। রাজশাহীর বিভিন্ন স্থানে তাঁদের মাজার রয়েছে। সৈয়দ শাহ আববাস, সৈয়দ দিলাল বুখারী, শাহ সুলতান এবং শাহ করম আলীর মাজার যথাক্রমে বাঘা, দিলালপুর, সুলতানগঞ্জ ও বিড়ালদহে রয়েছে।

হযরত শাহ মখদুম রুপোশ (রহঃ) এর সমাধি: মূল সমাধির দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ যথাক্রমে ৯ ফুট ৭ ইঞ্চি ও ৬ ফুট ৭ ইঞ্চি। সমাধি সৌধের ভিতরের দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ যথাক্রমে ১৭ ফুট সাড়ে ৩ ইঞ্চি ও ১৭ ফুট সাড়ে ৩ ইঞ্চি। সমাধির পশ্চিমধারে হযরত শাহ মখদুম রুপোশ (রহঃ) এর ভাতিজা সম্পর্কিত হযরত শাহনূর (রহঃ) এর সমাধি বলে প্রচলন আছে। মসজিদের সামনে দরগার তোরণটি নির্মিত হয় বাংলা ১৩০৫ সালে। এটাতে আয়াতে কোরআন খোদিত একটি প্রাচীন লিপি আছে।

দরগার হুজুর খানা ও মসজিদ: দরগার হুজুর খানা রাজশাহীর প্রাচীনতম নিদর্শন। কাজী মোহাম্মদ মিছের তার রাজশাহীর ইতিহাস (১ম খন্ড) গ্রন্থে এটাকে শাহ মখদুমের হুজুর খানা বা সাধন পীঠ বলে উল্লেখ করেছেন। তার মতে, এটাই রাজশাহী মহানগরীর প্রথম মসজিদ। এক গম্বুজ বিশিষ্ট হুজুর খানাটির পশ্চিম দেওয়ালে একটি ক্ষুদ্র মেহরাব ও পূর্ব দেওয়ালে একটি ছোট প্রবেশ পথ ছাড়া দরজা জানালা নাই। ভিতরে ৮/১০ জন একসঙ্গে নামাজ পড়বার মত জায়গা আছে। এর উত্ত-দক্ষিণ দৈর্ঘ্য ১৪ ফুট, পূর্ব-পশ্চিম প্রস্থ ১৩ ফুট ৭ ইঞ্চি। প্রবেশ পথের দৈর্ঘ্য ৪ ফুট সাড়ে ৩ ইঞ্চি, উচ্চতা ১১ ফুট ৫ইঞ্চি, গম্বুজের উপরের পরিসর ১৫ ফুট ৯ ইঞ্চি।

তিন গম্বুজ মসজিদ: দরগার তিন গম্বুজ মসজিদটি নবাবী আমলে তৈরী হয় বলে জনশ্রুতি আছে। এ সম্পর্কে গল্প আছে যে, জনৈক মুসলমান সওদাগর নদী পথে বিপদগ্রস্ত হয়ে হযরত শাহ মখদুম রুপোশ (রঃ) কে স্মরণ করেন। তিনি সে বিপদ থেকে মুক্ত হয়ে এই মসজিদ নির্মাণ করেন। এর দৈর্ঘ্য ৪০ ফুট, প্রস্থ ১৬ ফুট, ভিতরের পরিসরের দৈর্ঘ্য ৩৪ ফুট সাড়ে ৫ ইঞ্চি, প্রস্থ ১০ ফুট ১০ ইঞ্চি। তিনটির মেহরাবের মধ্যে মধ্যবর্তীটি অপেক্ষাকৃত বড়। উত্তর-দক্ষিণ দেয়ালে দুটি করে ৪টি তাক ও ১টি করে দুটি জানালা আছে। পূর্ব দেয়ালে সমপরিমাপের ৩টি প্রবেশ পথ। এর কপাটগুলো পরবর্তীকালে নির্মিত হয়। ২০ শতাব্দীলর গোড়ার দিকে পরপর দুটি বারান্দা ও মিনারটি নির্মিত হয়।

শিলালিপি ও আলীকুলি বেগ: হযরত শাহ মখদুম রুপোশ (রঃ) এর সমাধি সৌধের প্রবেশ দ্বারের উপরিভাগে জনৈক আলীকুলী বেগ কর্তৃক রচিত দৈর্ঘ্য ১০ ইঞ্চি ও প্রস্থ ৩৬ ইঞ্চি চার লাই বিশিষ্ট একটি ফারসী ভাষার লিখিত শিলা লিপি আছে। এই লিপিতে ১০৪৫ হিজরীতে শাহ্ দরবেশের কবরের উপর গম্বুজ নির্মাণের কথা উল্লেখ আছে।

সূত্রঃ উইকিপিডিয়া

(Visited 132 times, 1 visits today)
Share :
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

Be the First to Comment!

Notify of
avatar